টেক জায়েন্টস ও এ আই (Tech Giants & AI)

উদীয়মান অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: মূল্যায়নে বিশ্বব্যাংক

উন্নয়নশীল ও বিকাশমান দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতি সুনিশ্চিত করতে প্রযুক্তি সর্বদা একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। সাম্প্রতিক এক বিশেষ মূল্যায়নে বিশ্বব্যাংক প্রকাশ করেছে যে, উদীয়মান অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি কৌশলগত 'লাইফলাইন' বা জীবনরক্ষাকারী মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং সম্পদের নানা বৈষম্যের মুখোমুখি হওয়া অনুন্নত ও বিকাশমান অঞ্চলগুলোর ছোট ও মাঝারি আকারের শিল্পের জন্য প্রযুক্তিগত এই রূপান্তর অভূতপূর্ব সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ ঘটাতে পারলে এই দেশগুলো বহু পুরনো অর্থনৈতিক বাধা অতিক্রম করে বিশ্বমঞ্চে নতুন শক্তিতে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

 

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল আর কেবল উন্নত ও ধনী বিশ্বেই সীমাবদ্ধ নেই। উদীয়মান অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবসায়িক কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, অপচয় রোধ এবং পণ্য উৎপাদনের গতি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে বিকাশমান দেশগুলোর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বা এসএমই খাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে নতুন এক দিগন্তের সন্ধান পাচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় সমাধান ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসায়িক পরিচালন ব্যয় আশাতীতভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যার ফলে দেশীয় ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের বড় প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোর সাথেও সমান তালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতা অর্জন করছে।

 

এসএমই খাতের বিকাশ ও কর্মসংস্থান

 

উদীয়মান বিশ্বের সামগ্রিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে। তবে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক পুঁজি, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অভাবে এই খাতটি দীর্ঘকাল নানা জটিলতায় ভুগেছে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় নিখুঁত উপাত্ত বিশ্লেষণ, উন্নত গ্রাহক সেবা, এবং দক্ষ সরবরাহ শৃঙ্খল পরিচালনা অত্যন্ত সহজতর হয়ে উঠেছে। এর ফলে উদীয়মান অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল কাজের গতিই ত্বরান্বিত করছে না, বরং নতুন ব্যবসায়িক মডেল প্রতিষ্ঠা এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে সরাসরি অবদান রাখছে। বিশ্বব্যাংক বিশ্বাস করে যে, উদ্যোক্তারা যদি স্বল্প খরচে এই প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারেন, তবে তা স্থানীয় অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

 

বাধা ও টেকসই ভবিষ্যতের কৌশল

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন আশার সঞ্চার করলেও উদীয়মান অর্থনৈতিক দেশগুলোতে এটি পুরোপুরি বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। এর মধ্যে পর্যাপ্ত ডিজিটাল অবকাঠামোর অভাব, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেটের অসমান সুযোগ অন্যতম। তবে সময়োপযোগী সরকারি নীতি গ্রহণ, মৌলিক অবকাঠামোতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বিশ্বব্যাংকের মতে, আন্তর্জাতিক কারিগরি সহায়তা এবং উদ্ভাবনী নীতিমালার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি স্থিতিশীল এবং ন্যায়সঙ্গত প্রযুক্তিগত পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

 

সামগ্রিক পর্যালোচনায় বলা যায়, বিশ্বায়নের এই যুগে আধুনিক প্রযুক্তিকে বাদ দিয়ে কোনো জাতির পক্ষে টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়। উদীয়মান অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়নশীল অনুন্নত দেশগুলো তাদের দারিদ্র্য নিরসন, বেকারত্ব দূরীকরণ ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবধান কমানোর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য সহজে অর্জন করতে পারে। তবে এজন্য সরকার, বেসরকারি বাণিজ্যিক খাত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একযোগে সমন্বিতভাবে কাজ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। সঠিক কৌশল, অবকাঠামোগত সংস্কার ও সময়োপযোগী আর্থিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিশ্চিতভাবেই আগামী দিনে বিকাশমান বিশ্বের নতুন অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠবে।

সব বিভাগের সর্বশেষ