টেক জায়েন্টস ও এ আই (Tech Giants & AI)

এক সপ্তাহে দুটি বাজি: পারপ্লেক্সিটি ও পুলসাইডে কেন হাত বাড়াচ্ছে এনভিডিয়া?

চিপ তৈরির জগতে এনভিডিয়া এখন একচেটিয়া নাম। কিন্তু গত এক সপ্তাহে সংস্থাটি যা করল, তা স্রেফ চিপ বিক্রির গল্প নয় — এটা গোটা এআই দুনিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করার এক পরিকল্পিত চাল। একদিকে এনভিডিয়া কথা বলছে এআই সার্চ সংস্থা পারপ্লেক্সিটিতে বিনিয়োগ নিয়ে, ভ্যালুয়েশন প্রায় ৩,০০০ কোটি (৩০ বিলিয়ন) ডলারেরও বেশি। অন্যদিকে, নিজেদের ওপেন-সোর্স এআই মডেল তৈরির জন্য স্টার্টআপ পুলসাইডের সঙ্গে সই করেছে প্রায় ৭০০ কোটি (৭ বিলিয়ন) ডলারের চুক্তি। এক সপ্তাহে দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বাজি — একটা এআই অ্যাপ্লিকেশনের উপরের স্তরে, আরেকটা একদম মূল মডেল তৈরির স্তরে।

প্রযুক্তি সাংবাদিকতার সংস্থা দ্য ইনফরমেশন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনভিডিয়া ও পারপ্লেক্সিটির মধ্যে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে সংস্থাটির মূল্য দাঁড়াতে পারে ৩,০০০ কোটি ডলারের বেশি — মাত্র এক বছর আগের রাউন্ডের তুলনায় প্রায় দেড়গুণ বেশি । একই সপ্তাহে ফোর্বস ও একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পুলসাইড নামের একটি কোড-জেনারেশন এআই স্টার্টআপের সঙ্গে এনভিডিয়ার ৭০০ কোটি ডলারের চুক্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৬০০ কোটি ডলার সফটওয়্যার লাইসেন্সিংয়ের জন্য এবং বাকি ১০০ কোটি ডলার সরাসরি ইকুইটি বিনিয়োগ হিসেবে ।

 

সার সংক্ষেপে

  • এনভিডিয়া পারপ্লেক্সিটিতে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করছে, সম্ভাব্য ভ্যালুয়েশন ৩,০০০ কোটি ডলারের বেশি।
  • একই সপ্তাহে পুলসাইডের সঙ্গে প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের লাইসেন্সিং-কাম-বিনিয়োগ চুক্তি, লক্ষ্য নিজস্ব ওপেন-ওয়েট মডেল “নেমোট্রন” শক্তিশালী করা।
  • দুটো ডিলই একই লক্ষ্যে বাঁধা — এআই স্ট্যাকের প্রতিটি স্তরে এনভিডিয়ার উপস্থিতি ও চিপ-চাহিদা নিশ্চিত করা।
  • ভারতের মতো বাজারে বিনামূল্যের শক্তিশালী ওপেন-ওয়েট মডেলের জোগান বাড়লে, তা স্থানীয় ডেভেলপার ও স্টার্টআপদের জন্য সরাসরি উপকারী হতে পারে।

 

পারপ্লেক্সিটি ডিল: সার্চ থেকে এআই-এজেন্টে উত্তরণ

 

পারপ্লেক্সিটি প্রথমে পরিচিত হয়েছিল গুগলের বিকল্প হিসেবে একটি এআই-চালিত সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে। কিন্তু সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির আসল ইঞ্জিন এখন “পারপ্লেক্সিটি কম্পিউটার” — একটি এআই এজেন্ট প্ল্যাটফর্ম, যা ব্যবহারকারীর হয়ে সরাসরি কাজ সম্পন্ন করে দেয় (যেমন বুকিং করা, রিসার্চ করা বা তথ্য বিশ্লেষণ করা)। এই বদলের সুবাদে সংস্থার বার্ষিক আয় গত এক বছরে প্রায় তিনগুণ বেড়েছে — ২৫ কোটি ডলার থেকে ৭৫ কোটি ডলারেরও বেশি।

পারপ্লেক্সিটি এখন পর্যন্ত মোট প্রায় ১৭০ কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছে, এবং সংস্থার সিইও অরবিন্দ শ্রীনিবাস ২০২৮ সালের মধ্যে আইপিও-র সম্ভাবনা নিয়েও ভাবছেন বলে জানা গেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, চলতি বছরের মার্চ মাসেই পারপ্লেক্সিটি এনভিডিয়ার “নেমোট্রন কোয়ালিশন”-এ যোগ দিয়েছিল — একটি জোট, যার লক্ষ্য চিনা এআই মডেলগুলির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ওপেন এআই মডেলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, এই বিনিয়োগ আচমকা কোনও সিদ্ধান্ত নয়, বরং বহুদিনের সম্পর্কের স্বাভাবিক পরিণতি।

 

পুলসাইড ডিল: নিজের মডেল তৈরির দিকে এনভিডিয়া

 

পুলসাইড এমন একটি স্টার্টআপ, যারা কোড লেখার (কোডিং) জন্য বিশেষায়িত এআই মডেল তৈরি করে। সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ মডেল-নির্মাণ প্রযুক্তি — যাকে বলা হয় “মডেল ফ্যাক্টরি” — এখন লাইসেন্স নিচ্ছে এনভিডিয়া, সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন পুলসাইডের ১০০-রও বেশি ইঞ্জিনিয়ার, যাঁরা কাজ করবেন এনভিডিয়ার নিজস্ব ওপেন-ওয়েট মডেল প্রকল্প “নেমোট্রন”-এর জন্য। তবে পুলসাইডের প্রতিষ্ঠাতারা সংস্থা হিসেবে স্বতন্ত্রই থাকছেন — এটি সরাসরি অধিগ্রহণ নয়, বরং একটি অ-এক্সক্লুসিভ (non-exclusive) লাইসেন্সিং ও প্রতিভা-আকর্ষণের চুক্তি।

এই ডিলের পেছনের গল্পটাও তাৎপর্যপূর্ণ। পুলসাইড আগে ২০০ কোটি ডলারের একটি ফান্ডিং রাউন্ড বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যার জেরে সংস্থাটি হারিয়ে ফেলে ৪০,০০০-টি জিবি৩০০ চিপের একটি নির্ধারিত ক্লাস্টার। অর্থাৎ, আর্থিক সংকটে পড়া এক প্রতিভাবান দলকে এনভিডিয়া কাজে লাগাল নিজের কৌশলগত লক্ষ্যে। এটি অনেকটা গত ডিসেম্বরে (২০২৫) এনভিডিয়ার গ্রক (Groq)-এর ইনফারেন্স প্রযুক্তি ২,০০০ কোটি ডলারে কেনার মতোই একটি পদক্ষেপ।

কেন গুরুত্বপূর্ণ

 

এক নজরে দুটি ডিল সম্পূর্ণ আলাদা মনে হতে পারে — একটা বিনিয়োগ একটি জনপ্রিয় কনজিউমার অ্যাপে, আরেকটা প্রযুক্তি লাইসেন্সিং একটি কম পরিচিত স্টার্টআপ থেকে। কিন্তু আসল ছবিটা বোঝা জরুরি তিনটি কারণে।

প্রথমত, এটা এনভিডিয়ার একটি সচেতন দ্বিমুখী কৌশল। এআই স্ট্যাকের (স্তরবিন্যাসের) একদম উপরের দিকে — অর্থাৎ যেখানে সাধারণ মানুষ অ্যাপ ব্যবহার করেন — সেখানে বিনিয়োগ করছে পারপ্লেক্সিটির মাধ্যমে। আবার একদম নিচের দিকে — যেখানে মূল এআই মডেল তৈরি হয় — সেখানেও নিজের জায়গা পাকা করছে পুলসাইডের ইঞ্জিনিয়ার ও প্রযুক্তি দিয়ে। ফলে স্ট্যাকের যে স্তরই ভবিষ্যতে সবচেয়ে লাভজনক হোক না কেন, এনভিডিয়া সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত থাকছে।

দ্বিতীয়ত, দুটো ডিলের পেছনেই একই আর্থিক যুক্তি কাজ করছে — যে সংস্থাগুলিতে এনভিডিয়া বিনিয়োগ করে, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই টাকার একটা বড় অংশ খরচ করে এনভিডিয়ার নিজের চিপ কেনার জন্যই। অর্থাৎ, বিনিয়োগের টাকা ঘুরেফিরে এনভিডিয়ার নিজের রাজস্বেই ফিরে আসে। বিশ্লেষকদের একাংশ এই চক্রটিকে নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন — এটি কি সত্যিকারের চাহিদা, নাকি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা একটি বৃত্ত?

তৃতীয়ত, ভারত ও বাংলাভাষী ডেভেলপার-স্টার্টআপ বাস্তুতন্ত্রের জন্য এর একটা সরাসরি প্রভাব আছে। নেমোট্রন প্রকল্পের লক্ষ্য একটি শক্তিশালী, বিনামূল্যের (open-weight) মার্কিন এআই মডেল তৈরি করা, যা চিনের ডিপসিক (DeepSeek), কোয়েন (Qwen)-এর মতো মডেলগুলির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। ভারতের এআই স্টার্টআপ ও গবেষকরা প্রায়ই ব্যয়বহুল ক্লোজড মডেলের বদলে বিনামূল্যের ওপেন-ওয়েট মডেলের উপর নির্ভর করেন — ফলে নেমোট্রন যদি সত্যিই শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তা এই ইকোসিস্টেমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন বিকল্প হয়ে উঠতে পারে, বিশেষত এমন এক সময়ে যখন মার্কিন-চিন প্রযুক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।

এনভিডিয়ার এই কৌশল নতুনও নয়। ২০০৭ সাল থেকে সংস্থাটি তাদের CUDA সফটওয়্যার বিনামূল্যে দিয়ে আসছে, যা পরবর্তীতে ডেভেলপারদের এমনভাবে বেঁধে ফেলেছিল যে এনভিডিয়ার চিপ কার্যত অপরিহার্য হয়ে ওঠে। পুলসাইড ও নেমোট্রন প্রকল্পের মাধ্যমে একই ছক এবার প্রয়োগ হচ্ছে এআই মডেলের ক্ষেত্রে — বিনামূল্যের শক্তিশালী মডেল ছড়িয়ে দিয়ে, তার নিচের প্রতিটি স্তরে (অর্থাৎ চিপ ও পরিকাঠামোয়) চাহিদা বাড়ানো। 

সব বিভাগের সর্বশেষ