ম্যাকেনজি স্কটের দানে ৪০ বিলিয়ন ডলারের চিকিৎসা ঋণ মকুব
আধুনিক যুগে ধনকুবেরদের দানশীলতা বা ফিলানথ্রপির ক্ষেত্রে এক নতুন এবং অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ম্যাকেনজি স্কট। তিনি কেবল অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের প্রাক্তন স্ত্রী হিসেবেই পরিচিত নন, বরং তার নিজের পরিচয়ে তিনি আজ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং উদার সমাজসেবী। সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা একটি খবর অনুযায়ী, ম্যাকেনজি স্কট তার অ্যামাজনের বিপুল শেয়ারের প্রায় অর্ধেক বিক্রি করে দিয়েছেন এবং সেই অর্থ থেকে এমন এক উদ্যোগে বিনিয়োগ করেছেন, যার ফলে সাধারণ মানুষের কাঁধ থেকে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের চিকিৎসা ঋণ বা মেডিক্যাল ডেট সম্পূর্ণভাবে মকুব করা সম্ভব হয়েছে। এই পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

অ্যামাজনের শেয়ার বিক্রি এবং সম্পদের পুনর্বিন্যাস
২০১৯ সালে জেফ বেজোসের সঙ্গে দীর্ঘ ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসানের পর, বিবাহবিচ্ছেদের চুক্তি অনুযায়ী ম্যাকেনজি স্কট অ্যামাজনের মোট শেয়ারের ৪ শতাংশের মালিকানা লাভ করেন। সেই সময় এই শেয়ারের মূল্য ছিল প্রায় ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা তাকে রাতারাতি বিশ্বের অন্যতম ধনী নারীতে পরিণত করে। তবে তিনি তার এই বিপুল সম্পদ নিজের ভোগবিলাসের জন্য কুক্ষিগত করে রাখেননি। বরং তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, সমাজের পিছিয়ে পড়া এবং দুস্থ মানুষের কল্যাণে তিনি তার এই সম্পদের সিংহভাগ দান করবেন।
সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, ম্যাকেনজি স্কট ধীরে ধীরে তার মালিকানায় থাকা অ্যামাজনের শেয়ারের প্রায় অর্ধেক অংশ বিক্রি করে দিয়েছেন। এই শেয়ার বিক্রির মূল উদ্দেশ্য হলো দাতব্য কাজে ব্যবহার করার জন্য তরল অর্থ বা লিকুইড ক্যাশ সংগ্রহ করা। ধনকুবেররা সাধারণত নিজেদের মূলধন বা শেয়ার ধরে রেখে তার লভ্যাংশ দান করতে পছন্দ করেন, যাতে তাদের ক্ষমতার ওপর কোনো প্রভাব না পড়ে। কিন্তু ম্যাকেনজি স্কট এই প্রথাগত পথে হাঁটেননি। তিনি সরাসরি শেয়ার বিক্রি করে তার সম্পদকে সমাজকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত করেছেন। এটি কর্পোরেট এবং ফিলানথ্রপিক বিশ্বে এক বিশাল বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে, কারণ এত দ্রুত এবং এত বড় পরিসরে সম্পদ দান করার নজির ইতিহাসে বিরল।
চিকিৎসা ঋণ মকুবের অভিনব উদ্যোগ
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ শুধুমাত্র চিকিৎসা করাতে গিয়ে বিশাল অঙ্কের ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েন। এই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যায়, এমনকি অনেকে নিজেদের বাড়িঘরও হারান। এই ভয়াবহ সামাজিক সংকট দূর করার লক্ষ্যে ম্যাকেনজি স্কট এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তিনি ‘আরআইপি মেডিক্যাল ডেট’ (RIP Medical Debt)-এর মতো বিভিন্ন অলাভজনক সংস্থাগুলোকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করেছেন।
এই সংস্থাগুলোর কাজের পদ্ধতি অত্যন্ত অভিনব। তারা হাসপাতাল বা ঋণ সংগ্রাহক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বকেয়া এবং অনাদায়ী চিকিৎসা ঋণগুলো অত্যন্ত কম মূল্যে কিনে নেয়। এরপর তারা সেই ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের জানিয়ে দেয় যে, তাদের আর কোনো ঋণ পরিশোধ করতে হবে না। ম্যাকেনজি স্কটের মতো মহানুভব ব্যক্তিদের আর্থিক অনুদানের ফলেই এই সংস্থাগুলো এত বড় পরিসরে কাজ করতে সক্ষম হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার এই দানের ফলে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের চিকিৎসা ঋণ সম্পূর্ণভাবে মকুব করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ এক ভয়ানক মানসিক এবং আর্থিক চাপ থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তাদের কাছে এই সাহায্য এক নতুন জীবনের সূচনার মতো।
‘গিভিং প্লেজ’ এবং ম্যাকেনজির প্রতিশ্রুতি
সম্পদশালী ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ যেখানে নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধিতে মগ্ন, সেখানে ম্যাকেনজি স্কট ‘গিভিং প্লেজ’ (Giving Pledge)-এ স্বাক্ষর করে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিলেন। ‘গিভিং প্লেজ’ হলো বিল গেটস এবং ওয়ারেন বাফেটের শুরু করা একটি উদ্যোগ, যেখানে বিশ্বের শীর্ষ ধনীরা নিজেদের জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর তাদের সম্পদের অন্তত অর্ধেক সমাজকল্যাণে দান করার প্রতিশ্রুতি দেন। ম্যাকেনজি স্কট কেবল এই প্রতিশ্রুতিতে স্বাক্ষর করেই থেমে থাকেননি, তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তা বাস্তবায়িত করতে শুরু করেছেন।
তিনি বিশ্বাস করেন যে, তার এই সম্পদের ওপর সমাজের একটি বড় অংশের অধিকার রয়েছে এবং এটি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফসল, যা কিছু মানুষকে অস্বাভাবিকভাবে ধনী করে তোলে। তাই এই সম্পদ যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য। তার দানের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি কোনো শর্ত ছাড়াই অনুদান দিয়ে থাকেন। সাধারণত বড় দাতারা অনুদান দেওয়ার সময় বিভিন্ন শর্ত আরোপ করেন এবং কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু ম্যাকেনজি স্কট বিশ্বাস করেন যে, স্থানীয় স্তরে কাজ করা সংস্থাগুলোই তাদের সমস্যা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো বোঝে। তাই তিনি তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে অর্থ প্রদান করেন, যা এই সংস্থাগুলোকে আরও স্বাধীন এবং কার্যকরভাবে কাজ করতে সাহায্য করে।
‘ইল্ড গিভিং’: দান করার এক নতুন মডেল
নিজের দাতব্য কাজগুলোকে আরও সুশৃঙ্খল এবং স্বচ্ছ করার জন্য ম্যাকেনজি স্কট ‘ইল্ড গিভিং’ (Yield Giving) নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তিনি জনসমক্ষে প্রকাশ করেন যে, তিনি কোন সংস্থায় কত টাকা দান করেছেন। ‘ইল্ড’ শব্দের একটি অর্থ হলো অন্যের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়া। তিনি মনে করেন যে, দাতাদের উচিত নিজেদের কর্তৃত্ব ছেড়ে দিয়ে যারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন, তাদের ওপর বিশ্বাস রাখা এবং তাদের কাজের পরিসর বৃদ্ধি করতে সাহায্য করা।
সম্প্রতি তিনি একটি ‘ওপেন কল’ বা উন্মুক্ত আহ্বানের মাধ্যমে অনুদান প্রদান করার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এর মাধ্যমে যেকোনো ছোট এবং মাঝারি স্তরের অলাভজনক সংস্থা তাদের কাজের বিবরণ দিয়ে অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি সেই সব সংস্থাকে খুঁজে বের করছেন, যারা হয়তো প্রচারের আলো থেকে দূরে রয়েছে, কিন্তু সমাজের কল্যাণে নীরবে কাজ করে চলেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ক্ষমতায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে মানবাধিকার রক্ষার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি নিরলসভাবে অনুদান দিয়ে চলেছেন। তার এই ‘নো-স্ট্রিংস-অ্যাটাচড’ (no-strings-attached) মডেলটি এখন ফিলানথ্রপির জগতে এক নতুন দৃষ্টান্ত বা গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডে পরিণত হয়েছে।
আমেরিকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং ঋণগ্রস্ত মানুষের মুক্তি
মার্কিন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মূলত বেসরকারি বীমা এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। যাদের কাছে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য বীমা নেই বা যাদের বীমা সব ধরনের চিকিৎসার খরচ বহন করে না, তারা গুরুতর অসুস্থ হলে সহজেই বিপুল পরিমাণ ঋণের শিকার হন। এমনকি অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারও হঠাৎ আসা কোনো বড় অসুখের চিকিৎসার খরচ সামলাতে গিয়ে দেউলিয়া হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা ঋণ মকুব করা কেবল একটি আর্থিক সাহায্য নয়, এটি একটি মানবাধিকার রক্ষার কাজ।
ম্যাকেনজি স্কট যখন এই খাতটিকে তার দানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিলেন, তখন তা আমেরিকার লক্ষ লক্ষ পরিবারের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াল। যখন কোনো পরিবারের ৪০ বা ৫০ হাজার ডলারের একটি বকেয়া চিকিৎসা বিল হঠাৎ করে মকুব হয়ে যায়, তখন সেই পরিবারের সদস্যরা আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারেন। তারা তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় খরচ করতে পারেন, পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারেন এবং নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে পারেন। ম্যাকেনজি স্কট অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, সিস্টেমিক বা কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি সরাসরি এবং তাৎক্ষণিক সাহায্যেরও প্রয়োজন রয়েছে। আর তাই তিনি এমন একটি পন্থা অবলম্বন করেছেন, যার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যখন বিপুল সংখ্যক মানুষের চিকিৎসা ঋণ মকুব করা হয়, তখন তা পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ, যে অর্থ তারা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যয় করতেন, সেই অর্থ তারা এখন অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা বা বিনিয়োগের কাজে লাগাতে পারেন। এটি বাজার ব্যবস্থাকে চাঙ্গা করতে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। ম্যাকেনজি স্কটের এই দান শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্তরে নয়, বরং বৃহত্তর অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
শেষ কথা
ম্যাকেনজি স্কট তার অভাবনীয় দানশীলতার মাধ্যমে শুধু নিজের সম্পদেরই পুনর্বণ্টন করছেন না, বরং তিনি গোটা বিশ্বের ধনকুবেরদের সামনে একটি প্রশ্নচিহ্ন এবং একইসঙ্গে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অ্যামাজনের শেয়ার বিক্রি করে সেই অর্থকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা, বিশেষ করে ৪০ বিলিয়ন ডলারের চিকিৎসা ঋণ মকুবের মতো উদ্যোগ, ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, প্রকৃত ক্ষমতা সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার মধ্যে নয়, বরং সেই সম্পদকে মানবকল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। আগামী দিনেও তার এই উদ্যোগ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে এবং বিশ্বের অন্যান্য ধনী ব্যক্তিদেরও সমাজকল্যাণে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করবে। ম্যাকেনজি স্কট আজ আর শুধু একজন ধনকুবের নন, তিনি বিশ্ব মানবতার এক অকৃত্রিম বন্ধু এবং আশার আলো।











