টেক জায়েন্টস ও এ আই (Tech Giants & AI)

মেটার এআই চ্যালেঞ্জের জবাবে Alibaba আনল নতুন মডেল

বর্তমান একুশ শতকের প্রযুক্তি বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এক অভাবনীয় ও যুগান্তকারী বিপ্লবের সূচনা করেছে। বিশ্বজুড়ে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখন এআই মডেল তৈরির এক তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। একদিকে যেমন চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) দিয়ে ওপেনএআই (OpenAI) এবং জেমিনি (Gemini) দিয়ে গুগল (Google) তাদের শক্তিশালী ক্লড-ভিত্তিক মডেল নিয়ে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করছে, ঠিক তেমনই ওপেন সোর্স (Open Source) এআই জগতেও চলছে তুমুল লড়াই। এই ওপেন সোর্স ইকোসিস্টেমে এতদিন মেটা (Meta) তাদের লামা (LLaMA) সিরিজের মডেলগুলোর মাধ্যমে একচেটিয়া রাজত্ব করে আসছিল। তবে এবার সেই আধিপত্যে ভাগ বসাতে এবং মেটার এআই চ্যালেঞ্জের সরাসরি জবাব দিতে চীনের শীর্ষস্থানীয় টেক জায়ান্ট Alibaba একটি নতুন, হালকা এবং 'ল্যাপটপ-উপযোগী' (Laptop-ready) এআই মডেল উন্মোচন করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি (CNBC)-এর এক প্রতিবেদনে Alibaba-এর এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথা বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

ল্যাপটপ-উপযোগী মডেল বলতে আসলে কী বোঝায়?

 

Alibaba-এর নতুন উন্মোচিত এই এআই মডেলটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি ‘ল্যাপটপ-উপযোগী’ বা ল্যাপটপ-রেডি। সাধারণত জেনারেটিভ এআই (Generative AI) মডেলগুলো চালানোর জন্য বিশাল ডেটা সেন্টার, শক্তিশালী সার্ভার এবং উচ্চ ক্ষমতার গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ (GPU)-এর প্রয়োজন হয়। এই মডেলগুলো এতটাই ভারী হয় যে সাধারণ ব্যবহারকারীদের কম্পিউটারে সেগুলো চালানো একপ্রকার অসম্ভব। কিন্তু Alibaba এমন একটি এআই মডেল তৈরি করেছে, যার প্যারামিটার বা আকার তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট এবং অপ্টিমাইজড। এর ফলে কোনো ইন্টারনেট সংযোগ বা ক্লাউড সার্ভারের সাহায্য ছাড়াই সরাসরি সাধারণ ল্যাপটপ বা পার্সোনাল কম্পিউটারে (PC) এই এআই মডেলটি চালানো সম্ভব হবে। একে প্রযুক্তি পরিভাষায় বলা হচ্ছে ‘অন-ডিভাইস এআই’ (On-device AI) বা ‘এজ কম্পিউটিং’ (Edge Computing)। এটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে সাধারণ কনফিগারেশনের ল্যাপটপগুলোর প্রসেসর এবং র‍্যাম ব্যবহার করেই এটি দ্রুত কাজ করতে পারে।

 

মেটার ওপেন সোর্স আধিপত্য এবং আলিবাবার কৌশল

 

মেটা যখন তাদের লামা (LLaMA) মডেলটি ওপেন সোর্স হিসেবে ডেভেলপারদের জন্য উন্মুক্ত করেছিল, তখন তা এআই গবেষণায় একটি নতুন যুগের সূচনা করেছিল। ওপেন সোর্স হওয়ার কারণে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ডেভেলপাররা মেটার এই মডেলটি বিনামূল্যে ব্যবহার করার এবং নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টমাইজ করার সুযোগ পান। এর ফলে মেটা খুব সহজেই বিশ্বব্যাপী এআই ডেভেলপারদের একটি বিশাল কমিউনিটি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। মেটার এই কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল গুগলের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোণঠাসা করা। তবে Alibaba মেটার এই কৌশলকেই এবার নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। Alibaba তাদের কিউয়েন (Qwen) সিরিজের অধীনে এই নতুন হালকা মডেলগুলো উন্মুক্ত করেছে, যা ডেভেলপারদের কাছে মেটার লামা মডেলের একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। Alibaba প্রমাণ করতে চাইছে যে, ওপেন সোর্স এআই তৈরিতে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি এশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোও সমানভাবে সক্ষম।

 

ক্লড এআই থেকে লোকাল এআই-তে রূপান্তরের কারণ

 

বর্তমানে বেশিরভাগ এআই টুলই ক্লাউড-নির্ভর। অর্থাৎ ব্যবহারকারী যখন কোনো প্রশ্ন করেন, তখন সেই ডেটা ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোম্পানির সার্ভারে যায় এবং সেখান থেকে উত্তর প্রসেস হয়ে ফিরে আসে। কিন্তু Alibaba-এর এই নতুন মডেলটি ক্লাউড কম্পিউটিং থেকে লোকাল এআই-তে রূপান্তরের একটি বড় ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, লোকাল ডিভাইসে এআই চালানো হলে ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজন হয় না। দ্বিতীয়ত, এটি অত্যন্ত দ্রুত কাজ করে কারণ সার্ভারে ডেটা আদান-প্রদানের জন্য কোনো বিলম্ব বা ‘ল্যাটেন্সি’ (Latency) থাকে না। তৃতীয়ত, ক্লাউড সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণ ও এআই এপিআই (API) ব্যবহারের খরচ অনেক বেশি। ছোট মডেলগুলো ব্যবহারকারীদের ল্যাপটপেই প্রসেস হওয়ার কারণে ডেভেলপার এবং সাধারণ ব্যবহারকারী উভয়েরই বিশাল অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় হয়।

 

ব্যবহারকারীদের ডেটা প্রাইভেসি এবং নিরাপত্তা বৃদ্ধি

 

লোকাল বা ল্যাপটপ-উপযোগী এআই মডেলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ডেটা প্রাইভেসি বা ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা। অনেক বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল বা আর্থিক সংস্থা তাদের সংবেদনশীল ডেটা ক্লাউড এআই প্ল্যাটফর্মগুলোতে আপলোড করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। কারণ ক্লাউডে ডেটা হ্যাক হওয়ার বা ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু Alibaba-এর এই নতুন মডেলটি যেহেতু ব্যবহারকারীর নিজস্ব ল্যাপটপ বা ডিভাইসেই চলবে, তাই কোনো ডেটাই ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাইরের সার্ভারে যাবে না। অর্থাৎ, ব্যবহারকারীর ডেটা সম্পূর্ণভাবে তার নিজের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। সাইবার নিরাপত্তার এই যুগে এই বৈশিষ্ট্যটি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের ব্যবহারকারীদের কাছে এই মডেলটিকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলবে।

 

ই পিসি (AI PC) এবং হার্ডওয়্যার বাজারের নতুন সম্ভাবনা

 

Alibaba-এর এই পদক্ষেপটি কেবল সফটওয়্যার জগতেই নয়, বরং হার্ডওয়্যার বা কম্পিউটার নির্মাণ শিল্পেও বড় প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে ইনটেল (Intel), এএমডি (AMD) এবং কোয়ালকম (Qualcomm)-এর মতো প্রসেসর নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নতুন চিপগুলোতে এআই প্রসেসিংয়ের জন্য ডেডিকেটেড নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট (NPU) যুক্ত করছে। বাজারে এখন ‘এআই পিসি’ (AI PC)-এর একটি নতুন ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। ঠিক এমন একটি সময়ে ল্যাপটপে সরাসরি চলতে সক্ষম একটি মডেল বাজারে আনা Alibaba-এর অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি সিদ্ধান্ত। ব্যবহারকারীরা এখন তাদের নতুন এআই পিসিগুলোর হার্ডওয়্যারের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারবেন এই ধরনের লোকাল মডেলগুলো দিয়ে।

 

বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র

 

এই এআই প্রতিযোগিতার পেছনে একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের যে দীর্ঘমেয়াদী স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, এটি তারই একটি অংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি চীনের কাছে উন্নত এআই চিপ বিক্রির ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্লাউড-ভিত্তিক বিশাল মডেল প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতেই Alibaba ছোট, আরও দক্ষ এবং লোকাল ডিভাইসে চলতে সক্ষম এআই মডেলগুলোর দিকে মনোনিবেশ করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, হার্ডওয়্যার বা চিপের সীমাবদ্ধতা থাকলেও অ্যালগরিদম এবং মডেল অপ্টিমাইজেশনের মাধ্যমে চীন এখনো বৈশ্বিক এআই দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমানে সমানে পাল্লা দিচ্ছে।

 

ডেভেলপারদের জন্য এর ব্যবহারিক সুবিধা

 

সাধারণ ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি এআই ডেভেলপার এবং গবেষকদের জন্যও এই মডেলটি একটি আশীর্বাদ। অনেক স্বাধীন ডেভেলপার বা ছোট স্টার্টআপ কোম্পানির পক্ষে ক্লাউড জিপিইউ ভাড়া করার মতো পর্যাপ্ত বাজেট থাকে না। Alibaba-এর এই মডেলটি তাদের সেই আর্থিক বাধা দূর করবে। এখন একজন ডেভেলপার তার সাধারণ ল্যাপটপেই জটিল এআই অ্যাপ্লিকেশন প্রোটোটাইপ করতে পারবেন। এটি উদ্ভাবনকে আরও ত্বরান্বিত করবে এবং এআই প্রযুক্তিকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য বা গণতান্ত্রিক (Democratization of AI) করে তুলবে।

 

পরিশেষে বলা যায়, মেটার এআই চ্যালেঞ্জের জবাবে Alibaba-এর এই নতুন ল্যাপটপ-উপযোগী মডেলটি প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি কেবল ওপেন সোর্স এআই ইকোসিস্টেমের প্রতিযোগিতাকেই তীব্র করবে না, বরং ব্যবহারকারীদের প্রাইভেসি সুরক্ষা, খরচ কমানো এবং অফলাইন এআই ব্যবহারের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। ক্লাউডের সীমাবদ্ধ গণ্ডি পেরিয়ে এআই প্রযুক্তি এখন সরাসরি মানুষের ব্যক্তিগত ডিভাইসে প্রবেশ করছে। আর এই রূপান্তরের যাত্রায় মেটা, গুগল ও ওপেনএআই-এর মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি চীনের Alibaba যে একটি শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

Latest across all sections