এআই ড্রোন হামলায় ইউক্রেনে নিহত সাধারণ নাগরিক: ভয়াবহ খবর
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এক চরম ও আশঙ্কাজনক অধ্যায়ের সূচনা হলো। মানুষের কোনো সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই—সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ড্রোন নিজ থেকে লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনে। দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের জাপোরিজিয়া শহরে গত ৬ই জুলাই ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ হামলায় তিনজন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিই বিশ্বে নথিবদ্ধ হওয়া প্রথম ঘটনা, যেখানে কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্পূর্ণ সয়ংক্রিয় এআই চালিত রুশ ড্রোন বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর কারণ হলো।

কীভাবে ঘটল এই মারাত্মক ঘটনা?
ঘটনার দিন প্রায় ছয়টি ছোট ফিক্সড-উইং ড্রোনের একটি দল জাপোরিজিয়া শহরের দিকে উড়ে আসে। ইউক্রেনীয় তদন্তকারীদের মতে, ড্রোনগুলোকে মূলত মানব অপারেটর দ্বারা একটি নির্দিষ্ট পেট্রোল পাম্পের দিকে যাওয়ার জন্য প্রোগ্রাম করা হয়েছিল। কিন্তু এলাকাটিতে পৌঁছানোর পর ড্রোনের ভেতরের সয়ংক্রিয় প্রযুক্তি বা মেশিন ভিশন সিস্টেম নিজের মতো করে নিশানা বেছে নেয়।
গবেষকদের ধারণা, ড্রোনটি প্রোপেন ট্যাংকের মতো দেখতে বস্তু চিনে নিয়ে হামলা চালায়। তবে নির্দিষ্ট স্থানে আঘাত না করে এটি একটি পাশের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে বিস্ফোরিত হয়। এই ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত হন:
- টেটিয়ানা বুবাইনেটস (১৯): বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উদীয়মান শিক্ষার্থী।
- রোমান কার্পি (৪৮): গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
- ওলেক্সি সেভিরিন (৪১): চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ড্রোনের ভেতরে পাওয়া গেল বাণিজ্যিক চিপ
উদ্ধার হওয়া ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে ইউক্রেনীয় ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা স্তম্ভিত হয়ে যান। কোনো সিগন্যাল আদান-প্রদানের জন্য ড্রোনে কোনো অ্যান্টেনা ছিল না। অর্থাৎ দূর থেকে কোনো মানব চালক এটিকে নিয়ন্ত্রণ করছিল না। বদলে ড্রোনের ভেতরে পাওয়া গেছে মার্কিন প্রযুক্তিসংস্থা এনভিডিয়া (Nvidia)-র তৈরি ‘জেটসন ওরিন’ (Jetson Orin) মিনি কম্পিউটার চিপ।
এনভিডিয়া নিশ্চিত করেছে যে চিপটি তাদের তৈরি। তবে এটি কোনো সামরিক সরঞ্জাম নয়, বরং সাধারণ কাজের জন্য উন্মুক্ত বাজারে সুলভে পাওয়া একটি বাণিজ্যিক প্রসেসর। রাশিয়াতে সরাসরি বিক্রি বন্ধ থাকলেও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এগুলো সংগ্রহ করা কঠিন কিছু নয়।
কেন এই ঘটনা মানবজাতির জন্য বিপদঘণ্টা?
যুদ্ধের ময়দানে প্রযুক্তি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই ঘটনা তারই প্রমাণ। এতদিন ড্রোন প্রযুক্তিতে মানুষের নির্দেশনা শেষ মুহূর্তে লাগত। কিন্তু এখন মেশিনকে সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হচ্ছে কার ওপর হামলা হবে।
- হিউম্যান-ইন-দ্য-লুপের অনুপস্থিতি: সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় মানুষের কোনো ভূমিকা না থাকায় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়ে।
- ভুল নিশানার ঝুঁকি: মেশিন কোনটা সত্যিকারের সামরিক অস্ত্র আর কোনটা সাধারণ বেসামরিক গ্যাসের বোতল, তা সঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হতে পারে।
যুদ্ধের নামে যন্ত্রকে মানুষের প্রাণ নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা জাপোরিজিয়ার এই মর্মান্তিক ঘটনা বিশ্ববাসীকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

