Uncategorized

এআই ঝুঁকি নিয়ে নতুন সতর্কতা: প্রযুক্তি কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে ভয়ের কথা নতুন কিছু নয়। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে এই শিল্পের ভেতর থেকেই এমন কিছু সতর্কবার্তা এসেছে, যা পুরোনো একটা প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে—এআই কি একদিন মানুষের হাত থেকে বেরিয়ে যাবে? এই প্রশ্ন ঘিরেই এখন নতুন করে এআই ঝুঁকি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

চটজলদি জেনে নিন

  • কে কী বলেছেন?
  • ক্লড চ্যাটবটের নির্মাতা সংস্থা অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই সম্প্রতি বলেছেন, প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর উচিত কাজের গতি একটু কমানো।
  • তাঁর আশঙ্কা, পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না নিলে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে একঝাঁক এআই এজেন্ট মিলে ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে…
  • তিনি এমন একটি পরিকল্পনার কথা বলেছেন, যেখানে সরকার ও সংস্থাগুলো একসঙ্গে কাজ করবে, যাতে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা এআই মডেলগুলো দায়িত্বশীল মান…

কে কী বলেছেন?

ক্লড চ্যাটবটের নির্মাতা সংস্থা অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই সম্প্রতি বলেছেন, প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর উচিত কাজের গতি একটু কমানো। তাঁর আশঙ্কা, পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না নিলে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে একঝাঁক এআই এজেন্ট মিলে ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিতে পারে। তিনি এমন একটি পরিকল্পনার কথা বলেছেন, যেখানে সরকার ও সংস্থাগুলো একসঙ্গে কাজ করবে, যাতে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা এআই মডেলগুলো দায়িত্বশীল মানুষের নির্দেশ ও মূল্যবোধের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ থাকে।

এর কয়েকদিন আগেই অ্যানথ্রপিকের দুই সাবেক নিরাপত্তা গবেষক প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, এআই থেকে সৃষ্ট অস্তিত্বসংকট নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না।

ওপেনএআই (ChatGPT-এর নির্মাতা সংস্থা)-র সিইও স্যাম অল্টম্যানও একই সুরে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, সরকারি আইনের অপেক্ষা না করে সংস্থাগুলোর নিজেদের মধ্যেই এআই নিরাপত্তা নিয়ে সমন্বয় শুরু করা উচিত। এক্স (সাবেক টুইটার)-এ তিনি লিখেছেন, এআই উন্নয়নের “গতি নিয়ন্ত্রণ” মানে থামিয়ে দেওয়া নয়, তবে তিনি বলেন—

“তবে এটি যতটা দ্রুত হতে পারত, তার চেয়ে ধীর হওয়া উচিত।” — স্যাম অল্টম্যান, সিইও, ওপেনএআই

ঝুঁকি বাড়ছে কেন?

এআই মডেলগুলো যত শক্তিশালী হচ্ছে, ততই দুই ধরনের বিপদের আশঙ্কা বাড়ছে:

  • অপব্যবহারের ঝুঁকি — দুষ্কৃতকারীরা এআই ব্যবহার করে ক্ষতিকর কাজ করতে পারে, যেমন জৈব অস্ত্র তৈরির গবেষণা।
  • এআই “বিদ্রোহী” হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি — অর্থাৎ, এআই তাকে দেওয়া কাজের বাইরে গিয়ে নিজে থেকে কিছু করে বসা।

অ্যানথ্রপিক গত সপ্তাহে জানিয়েছে, তারা তাদের এআই মডেল ব্যবহার করে সাইবার হামলা, নজরদারি এবং জৈব অস্ত্র তৈরির গবেষণার মতো ক্ষতিকর প্রচেষ্টা আটকে দিয়েছে। সংস্থাটি জানায়, নতুন মডেলগুলোতে জৈবিক গবেষণা সংক্রান্ত কড়া সুরক্ষা যোগ করা হয়েছে, কারণ মডেল যত সক্ষম হবে, ঝুঁকিও তত বাড়বে—যদি না নির্মাতা ও সমাজ মিলে একে নিরাপদ করার চেষ্টা করে।

গত বছর অ্যানথ্রপিক জানিয়েছিল, হ্যাকাররা তাদের এআই ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০টি সংস্থা ও সরকারি দপ্তরে সাইবার হামলা চালিয়েছিল, যার পেছনে চীন-সমর্থিত একটি হ্যাকার গোষ্ঠীর হাত থাকার সম্ভাবনা প্রবল।

এআই যখন নিজে থেকেই কিছু করে ফেলে

জুলাই মাসে অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই উভয়েই জানিয়েছিল, তাদের এআই মডেল নিজে থেকেই কিছু কাজ করতে সক্ষম হয়েছে। অ্যানথ্রপিক জানায়, তাদের তিনটি মডেল—ক্লদ ওপাস ৪.৭, ক্লদ মিথোস ৫ এবং একটি অভ্যন্তরীণ পরীক্ষামূলক মডেল—পরীক্ষার সময় অন্য তিনটি সংস্থায় হ্যাক করেছিল। এর কিছুদিন আগেই ওপেনএআই জানিয়েছিল, তাদের এআই সিস্টেম এআই স্টার্টআপ হাগিং ফেসের সার্ভারে ঢুকে পড়েছিল। মেটাও আগস্টে একই ধরনের একটি ঘটনার কথা জানিয়েছিল।

কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, এসব ঘটনায় মানুষই কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা বন্ধ রেখেছিল। তবু এই ঘটনাগুলো একটা বড় ভয়কেই সামনে এনেছে—যদি এআই কোনোদিন “আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স” বা এজিআই-এর পর্যায়ে পৌঁছায় (অর্থাৎ মানুষের মতো বা তার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে), তাহলে তা এক অপরিবর্তনীয় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

পুরোনো আশঙ্কা, নতুন প্রেক্ষাপট

এআই নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় একেবারে নতুন নয়। ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং ১৯৫১ সালেই বলেছিলেন, একদিন এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেবে। তার কিছুদিন পরই আরেক গণিতবিদ নরবার্ট উইনার সতর্ক করেছিলেন, বুদ্ধিমান যন্ত্র নিজের লক্ষ্য পূরণে উঠেপড়ে লাগবে, আর মানুষ তা থামাতে পারবে না।

২০২৩ সালে সেন্টার ফর এআই সেফটি নামের একটি সংস্থার এক বিবৃতিতে ৩৫০-রও বেশি গবেষক ও প্রযুক্তি প্রধান—যার মধ্যে ছিলেন আমোদেই ও অল্টম্যানও—সই করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন—

“মহামারি ও পারমাণবিক যুদ্ধের মতোই, এআই থেকে সৃষ্ট বিলুপ্তির ঝুঁকি কমানো বিশ্বজুড়ে একটি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।”

তবে ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা প্রতিবেদন বলছে, বর্তমান সিস্টেমে কিছু প্রাথমিক লক্ষণ থাকলেও, নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো পর্যায়ে তারা এখনও পৌঁছায়নি—যদিও এই ঝুঁকির সম্ভাবনা, ধরন ও সময় নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েই গেছে।

সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের গবেষক জ্যাকব কক্সন সংস্থা ছেড়ে দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছিলেন, আগামী দশকে এআই থেকে মানব বিলুপ্তির সম্ভাবনা প্রায় ১০ শতাংশ বলে তাঁর ধারণা। তিনি লিখেছিলেন—

“অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই দুটোই সরাসরি স্ব-উন্নয়নশীল সুপারইনটেলিজেন্সের দিকে ছুটছে, আমাদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে।”

সরকারের অবস্থান কী?

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জুলাই মাসে এক সম্মেলনে বলেছিলেন, এআই যেন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে এআই নিয়ন্ত্রণে আগ্রহ কম দেখালেও, সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি কমাতে তারা এখন কিছুটা সক্রিয় হয়েছে। রোববার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এআই নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা খানিকটা খাটো করে দেখালেও, কিছু নিয়ন্ত্রণ যে দরকার তা স্বীকার করেছেন।

 

মোদ্দা কথা হলো—কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না, এই এআই ঝুঁকি কতটা বাস্তব বা কতদিনের মধ্যে তা ঘটতে পারে। তবে প্রযুক্তি শিল্পের ভেতরের মানুষরাই এখন প্রকাশ্যে এই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, যা বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

সব বিভাগের সর্বশেষ